ইতিহাস

                                                      নিয়ামত নগর নিয়ামত উল্লাহ শাহ ফাজিল (ডিগ্রী)  মাদ্রাসার ইতিহাস

 

                                                                                                        বিছিমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

                                                                                নাহমাদুহু ওয়ানুছাল্লি ওয়ানুছাল্লিমু আলা রসুলিহিল করিম

 

অজ্ঞতা ও অন্ধকার থেকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে জ্ঞানের যে আলোকবর্তিকা নিয়ে প্রিয় নবী (দ.)’র আগমন, তার উজ্জ্বল্য সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সুশিক্ষার বিকল্প নেই। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, এই দ্রুত পরিবর্তনের মাঝেও আমাদের দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার মান আধুনিকায়নে অনেক পেছনে। ফলে এই সমাজে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি এসেছে বিমুখতা। এর নিরসনে প্রয়োজন মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সমন্বয় সাধন।তাই বর্তমান প্রজন্মকে সঠিক ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন সৎ, যোগ্য এবং আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান জামিরজুরী রজবিয়া আজিজিয়া রহমানিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার অভিযাত্রা।

দক্ষিণ চট্টলার ঐতিহাসিক জনপদ দোহাজারী। দোহাজারীর অভ্যন্তরেই অবস্থিত দ্বীনি জ্ঞান চর্চার পূন্যভূমি জামিরজুরী। সেই পবিত্র ভুমির বুকেই পুর্ণিমা চাঁদের ন্যায় ঝলকানী হয়ে আজ থেকে পাঁচ দশক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল “জামিরজুরী রজবিয়া আজিজিয়া রহমানিয়া সুন্নিয়া ফাজিল মাদ্রাসা” আজ শুনাব এই স্বনামধন্য মাদ্রাসার আদ্যোপান্ত।

নামকরণ ও প্রতিষ্ঠাঃ

অত্র মাদ্রাসার নাম “জামিরজুরী ইমাম শেরে বাংলা মাদ্রাসা” ছিল বলে জনশ্রুতি আছে। সবচেয়ে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় এ মাদ্রাসা বৃহত্তর পরিসরে প্রতিষ্টার প্রাক্কালে ‘জামিরজুরী রজবীয়া আজিজিয়া রহমানিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক স্তর উন্নতির ধারাবাহিকতায় সিনিয়র/ডিগ্রী এসব শব্দ যুক্ত হয়েছে৷ “রজবীয়া” দ্বারা উপমহাদেশের বিখ্যাত জ্ঞান তাপস, সুন্নি জামাতের ইমাম আলা হযরত আহমদ রেজা খাঁন বেলরভী (রহ) এর পবিত্র নাম ‘রেজা‘র দিকে ও “আজিজিয়া” দ্বারা বাংগালী সুন্নিদের মহান ইমাম আজিজুল হক শেরে বাংলা (রহ) এর পবিত্র নাম ‘আজিজ‘ এর দিকে ইংগিত করা হয়েছে। আর “রহমানিয়া” দ্বারা মাদ্রাসার ভুমিদাতা মরহুম আব্দুস সালাম চৌধুরীর পিতা মরহুম বদিউর রহমান এর দিকে নিসবত করা হয়েছে। এছাড়া সুন্নিয়া দ্বারা ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’ তথা ওহাবী/মওদুদি বিষবাষ্পমুক্ত হওয়ার দিকে ইংগিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাসঃ

১৯৬৮ সাল। জামিরজুরী নিবাসী মরহুম আল্লামা আব্দুল হাকিম নক্সবন্দী (রহ) তখন সবেমাত্র পড়াশুনা শেষ করেছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন মাদ্রাসায় তিনি খেদমতে লিপ্ত ছিলেন। একরাতে তিনি স্বপ্নযোগে ইমাম আলা হযরত আহমদ রেজা (রহ) এর সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং অত্র এলাকায় একটা দ্বীনি মারকায স্থাপনের জন্য আদিষ্ট হন। পরের দিন এলাকার অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম ও গন্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটা পরামর্শ সভার আয়োজন করেন। উক্ত পরামর্শ সভায় মুলত অত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্টার ভিত রচিত হয়। বিশেষ করে আল্লামা নুরুল ইসলাম লতিফি (প্রকাশ আউয়াল সাহেব হুজুর), আব্দুস সালাম চৌধুরী, মাওলানা আব্দুল আলীম ফকিরসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সরাসরি তত্ত্বাবধানে আলোর মুখ দেখতে শুরু করে অত্র মাদ্রাসা। ১৯৭১ সালে আল্লামা নক্সবন্দী (রহ) আনুষ্ঠানিক ভাবে “অধ্যক্ষ” পদ অলংকৃত করেন। তৎকালীন মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মরহুম আব্দুল হামিদ চেয়ারম্যান ।

প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোঃ

অত্র মাদ্রাসায় রয়েছে একটি প্রশাসনিক ভবন, ত্রিতল বিশিষ্ট একটি ছাত্রাবাস, দ্বিতল বিশিষ্ট দুইটি একাডেমিক ভবন, ছাত্রী কমন রুম, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী কর্ণার, হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু কর্ণার, লাইব্রেরী কক্ষ ও সরকারি কম্পিউটার ল্যাব। এছাড়া সুদৃশ্য মূল ফটক যে কারো নজর কাড়বে।

একাডেমিক স্তরসমুহঃ

অত্র মাদ্রাসায় শিশুশ্রেণি থেকে শুরু করে ফাজিল পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগে পাঠদান করা হয়। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ঢাকার অধীনে দাখিল, আলিম এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল (স্নাতক) কোর্স চালু রয়েছে। এছাড়া কামিল (স্নাতকোত্তর) পর্যায়ের অধিভুক্তির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। উক্ত মাদ্রাসায় সরকারি সিলেবাস ব্যতিরেকে নিজস্ব অতিরিক্ত পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন দ্বীনি/আকিদার কিতাবাদি পড়ানো হয়।

শিক্ষকবৃন্দঃ

অত্র মাদ্রাসার বর্তমান অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত বর্তমানে বর্তমান উপাধ্যক্ষ আল্লামা মুফতি সিরাজুদ্দিন আলকাদেরী। আরবী, বাংলা, ইংরেজী, ইতিহাস বিভিন্ন বিষয়ের সংশ্লিষ্ট প্রভাষক, দাখিল ও এবতেদায়ী পর্যায়ের বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকমন্ডলীসহ প্রায় ৩৪ জনের এক সুদক্ষ শিক্ষক প্যানেল আছে এ মাদ্রাসায়।

স্বীকৃতি ও প্রাপ্তিঃ

২০০৩ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের স্বর্ণ পদক লাভ। এছাড়া জাতীয়, স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব আছে প্রতিষ্ঠানটির। ইবতেদায়ী, জেডিসি, দাখিল, আলিম, ফাজিল প্রত্যেক পর্যায়ে প্রত্যেক বছরই কৃতী শিক্ষার্থীরা A+ এর সাথে বয়ে আনে সরকারী বৃত্তিসহ বিরল সম্মাননা।

সহশিক্ষা কার্যক্রমঃ

সাপ্তাহিক জমিয়ত এর প্রচলন দীর্ঘ দিন ধরেই চলে আসছে অত্র মাদ্রসায়। বিষয়ভিত্তিক বক্তৃতা করার সবটুকু এখানেই পেয়ে যায় শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বাৎসরিক দেয়ালিকা প্রকাশনা মাদ্রাসার ছাত্র পরিষদের একটি চমৎকার সহশিক্ষা উদ্যোগ।  আন্তঃশ্রেনী বিভিন্ন খেলাধুলার মাধ্যমে এখানে চর্চা হয় সুস্থ বিনোদনের। 

আক্বীদা, ইলম প্রচারের অবদানঃ

আহলে সুন্নাত ওয়াল জমাতের অর্থাৎ ইসলামের মূলধারা সুন্নীয়তের প্রচার প্রসারে এ মাদ্রাসার আসাতেজায়ে কেরামের অবদান অতুলনীয়। বিশেষ করে অত্র মাদ্রাসার সাবেক ও বর্তমান মুহাদ্দিস, শিক্ষকগণের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিখাদ নবী প্রেমের ফলে এই জনপদ আজ বাতিলমুক্ত। এছাড়া অত্র মাদ্রাসার অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম, ছাত্রবৃন্দের সাহসী পদক্ষেপ প্রতিটি ক্ষনে যেনো সুন্নীয়তকে নতুন জীবন দান করে। ১৯৮৪ সালে এই মাদ্রাসা থেকে এতদঞ্চলে প্রথম ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জশনে জুলুছ আরম্ভ হয় যা অদ্যাবধি জারি আছে। এছাড়া মসলকে আলা হযরত তথা সুন্নী আক্বীদার উপর নিয়মিত পাঠদান, সভা-সেমিনার আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে ইসলামের আসল শিক্ষা। অত্র মাদ্রাসার বিভিন্ন ছাত্র আজ বিভিন্ন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মুফতি, মুহাদ্দিস। ছাত্রদের হাত ধরে এই দ্বীনি মশালের দ্বীপ শিখা ছড়িয়ে পড়ুক যুগ থেকে যুগান্তরে.

Scroll to Top